
বান্দরবান প্রতিনিধি : বান্দরবানের নীলাচল সড়কে ‘যৌথ খামার এলাকা থেকে টাইগার পাড়া পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন’ শিরোনামে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এক ওটিএম টেন্ডার আহ্বান করেছিল। প্রকল্প অনুযায়ী ৩ কিলোমিটার ২৭০ মিটার সড়কটি জনবসতিবহুল এলাকায় উন্নয়ন করার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা গেছে, টেন্ডারে উল্লিখিত সড়ক বাদ দিয়ে উন্নয়ন কাজ চলছে সম্পূর্ণ জনবসতিহীন এলাকায়।
টাইগার পাড়া হয়ে সিনিয়র পাড়া পর্যন্ত জনশূন্য এলাকায় প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক নির্মাণ কাজ চলছে। দীর্ঘ এই সড়কের দু’পাশে নেই কোনো গ্রাম, নেই স্কুল-কলেজ বা সরকারি স্থাপনা। স্থানীয়দের দাবি, এই সড়কটি সাধারণ মানুষের কোনো উপকারে আসবে না; বরং এটি সুবিধা দেবে এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির মালিকানাধীন রিসোর্ট ও বাগানে যাতায়াতে। ফলে সরকারি অর্থের অপচয় এবং উন্নয়নকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠছে।
এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আওতায় ৪ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে যৌথ খামার থেকে টাইগার পাড়া পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার আহ্বান করা হয়। ৩ কিলোমিটার ২৭০ মিটার সড়কের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ৭ কোটি ৯৮ লাখ ৩২ হাজার ২৩৭ টাকা। হিমু কনস্ট্রাকশন নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন আওয়ামী লীগ নেতা কামরুল জামান মিলন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করে বলেন, টেন্ডারে জনবসতিবহুল এলাকার নাম ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে কোটি কোটি টাকার উন্নয়নকাজ চলছে সম্পূর্ণ জনবসতিহীন অঞ্চলে। যেখানে নেই কোনো গ্রাম, নেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকি সরকারি-বেসরকারি কোনো স্থাপনাও নেই। তাদের দাবি, সড়কটি নির্মিত হলে এর সুফল মূলত ভোগ করবে এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির মালিকানাধীন রিসোর্ট ও বাগান, যা সাধারণ মানুষের কাজে আসছে না। ফলে সরকারি অর্থের এ ব্যয় অপচয় হওয়ার পাশাপাশি উন্নয়নের নামে ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার সুযোগ তৈরি হচ্ছে এমনটা মনে করছেন বলে তারা।
টাইগার পাড়ার বাসিন্দা কালাচাং তঞ্চঙ্গ্যা। বলেন, যৌথ খামার থেকে টাইগার পাড়া পর্যন্ত সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন হাজারো পর্যটক ও স্থানীয় মানুষ চলাচল করেন এই রাস্তায়। অসংখ্য গর্তে ভরা এই সড়কটির সংস্কার না করে বরাদ্দের টাকায় কাজ করছে জনশূন্য এলাকায় এটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা ও সোহেল তঞ্চঙ্গ্যা জানান, টাইগার পাড়া থেকে রুপালী ঝর্ণা পর্যন্ত সড়কের পাশে নেই কোনো গ্রাম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সরকারি স্থাপনা।
তিনি বলেন, রুপালী ঝর্ণায় যেতে মানুষ কখনোই এই সড়ক ব্যবহার করে না। রেইচা বাজারের প্রধান সড়ক থেকে মাত্র এক কিলোমিটার গেলেই ঝর্ণায় যাওয়া যায়। তাই নতুন সড়কটি শুধু টাকা অপচয় ছাড়া।স্থানীয়দের কোন কাজে আসবে না।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের শুরুতে টাইগার পাড়ায় প্রায় ৭০টি পরিবার বসবাস করলেও এরপরের প্রায় ৩ কিলোমিটারজুড়ে রয়েছে কেবল ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চলমান নির্মাণাধীন রিসোর্ট। পুরো সড়কজুড়েই নেই কোনো জনবসতি আর নির্জন পাহাড়ি পথ। টাইগার পাড়া থেকে রুপালী ঝর্ণা ও সিনিয়র পাড়া পর্যন্ত নির্মাণাধীন সড়কের বিভিন্ন স্থানে পাহাড় কেটে মাটি সমান করা হচ্ছে। কোথাও পাহাড় কেটে সাইট ওয়ালের পাশে মাটি ভরাট করা হচ্ছে। পুরো সড়কজুড়ে পাহাড় কাটার দৃশ্য স্পষ্ট।
পাহাড় কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে বান্দরবান জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. রেজাউল করিম বলেন, সড়ক নির্মাণে পাহাড় কাটার অভিযোগ আমরা পেয়েছি। আমি বান্দরবানে দেড় বছর দায়িত্ব পালন করছি। এই সময়ে কোনো প্রতিষ্ঠান পাহাড় কাটার অনুমতি নেয়নি। এর আগে অনুমতি নেওয়া হয়েছে কিনা তা যাচাই করতে হবে। পাহাড়ি এলাকায় সড়ক উন্নয়নে কিছু কাটাকাটি হয়, তবে তার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের লিখিত অনুমতি অবশ্যই প্রয়োজন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বান্দরবান জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তাসাউর বলেন, পার্বত্য জেলাগুলোর সিস্টেম হলো আগে রাস্তা নির্মাণ করা হয়, পরে ধীরে ধীরে জনবসতি গড়ে ওঠে। বর্তমানে যে সড়কটি নির্মাণ করা হচ্ছে, তা টাইগার পাড়া হয়ে রুপালি ঝর্ণা হয়ে রেইচা মেইন সড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে। রাস্তাটি হলে রেইচা দিক দিয়েও যাতায়াত করা যাবে, আবার টাইগার পাড়ার দিক দিয়েও যাওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, সড়কের পাশে কারো ব্যক্তিগত রিসোর্ট বা কোনো নেতার বাগান রয়েছে কিনা, তা আমার দেখার বিষয় নয়। এ সড়কটি ২০১৩ সালেই এলজিইডির গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে এটা ভুল হয়েছে, রাস্তার নাম ‘যৌথ খামার-টাইগার পাড়া’ হওয়া উচিত ছিল না। রাস্তার নাম হওয়া উচিত ছিল ‘টাইগার পাড়া-রুপালি ঝর্ণা-রেইচা মেইন সড়ক’। এই দুই সড়কে দুইটি আইডি রয়েছে আইডি অনুযায়ী কার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন।