1. [email protected] : admin :
  2. [email protected] : banglar kagoj : banglar kagoj
বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪৫ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম ::
শেরপুরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে শহিদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে জেলা প্রশাসনের শ্রদ্ধা ভোলায় ৫ম শ্রেণির ছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ-ভিডিও ধারণ, তিন কিশোর গ্রেপ্তার ‘রিপাবলিক বাংলা’ ছাড়লেন ময়ূখ রঞ্জন আমরা নতজানু রাষ্ট্র পর্যায়ে আর কখনো ফিরে যাবো না : পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে ডকুমেন্টারিতে আবু সাঈদ নেই, সেটি কোনো ডকুমেন্টারি নয়: ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি নালিতাবাড়ীতে অপপ্রচারের অভিযোগে ইউনিয়ন বিএনপি’র পাল্টা সংবাদ সম্মেলন জুলাই জাদুঘর গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সঙ্গে আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরবে: প্রধানমন্ত্রী দেশের বারোটা বাজবে আর আমরা আঙুল চুষব, এটা হবে না: জামায়াত আমির জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে শেরপুরে বিতর্ক প্রতিযোগিতা

রক্তের আখরে লেখা গণঅভ্যুত্থান, ইতিহাসের নতুন বাঁকে বাংলাদেশ

  • আপডেট টাইম :: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬

বাংলার কাগজ ডেস্ক : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। দুপুর গড়াতেই খবর ছড়িয়ে পড়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর গণভবনে নেই। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ তখন গণভবনমুখী। সড়কে সড়কে মানুষের ঢল, কোথাও উল্লাস, কোথাও অনিশ্চয়তা, কোথাও আবার সংঘর্ষের আশঙ্কা।

জুলাই আন্দোলনের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। আন্দোলনকারীসহ অনেকের কাছে দিনটি ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে পরিচিত। মাত্র মাসখানেকের মধ্যে একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন এভাবে রাজনৈতিক চরিত্র লাভ করবে, এটা সাধারণ মানুষের চিন্তায়ও ছিল না।

কিন্তু এই পরিণতি কি একদিনে এসেছে? উত্তর হলো ‘না’। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক আন্দোলন, বিতর্কিত নির্বাচন, গুম-খুন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, অর্থনৈতিক চাপ, সীমাহীন দুর্নীতি। এসবের প্রভাব পড়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে। যার ফলে ওই আন্দোলন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রূপ নেয় নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানে।

এ ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, “২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানটা ছিল অর্গানিক অভ্যুত্থান। যেখানে আপামর জনসাধারণের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। সরকার এই আন্দোলনকে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ হিসেবে না দেখে বরং একটি ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে বিবেচনা করেছিল এবং আন্দোলনের প্রকৃত গতিপ্রকৃতি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল।”

ভয়ডরহীন আন্দোলনে ভেঙে পড়েছিল সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন

২০২৩ সালের শেষ ভাগ এবং ২০২৪ সালের শুরুতে বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত ফল না আনলেও জনমনে অসন্তোষের একটি স্তর তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কিন্তু সেই অসন্তোষ যেন বিস্ফোরণের অপেক্ষায় ছিল।

আদালতের এক রায়ে সুপ্ত অসন্তোষ রূপ নেয় আগ্নেয়গিরিতে

২০২৪ সালের জুনে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালসংক্রান্ত উচ্চ আদালতের একটি রায় সামনে আসে। এর প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবি ছিল, যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থা বাতিল বা যৌক্তিক সংস্কার করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দ্রুত আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

প্রথমদিকে কর্মসূচি ছিল ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, বিক্ষোভ মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি ও সড়ক অবরোধ। আস্তে আস্তে আন্দোলনের চরিত্র বদলাতে থাকে। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আন্দোলন মূলত কোটা ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, হামলা, শিক্ষার্থীদের আহত হওয়ার ঘটনা এবং পরে প্রাণহানির খবর আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষ শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানাতে শুরু করেন। অভিভাবকরা রাস্তায় নামেন। শিক্ষকরা বিবৃতি দেন। আইনজীবী, চিকিৎসক, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী—বিভিন্ন পেশার মানুষ প্রকাশ্যে সমর্থন জানান।

একপর্যায়ে আন্দোলনের মূল স্লোগান আর শুধু কোটা সংস্কার থাকেনি। রাষ্ট্র পরিচালনা, জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার এবং শেষমেশ আসে সরকারের পদত্যাগের দাবিও।

কোটা আন্দোলন কেন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিল?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোটা ছিল আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ, কিন্তু বিস্ফোরণের উপাদান অনেক আগেই জমা হয়েছিল।

দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংকুচিত পরিবেশ, বিরোধী দলগুলোর সীমিত রাজনৈতিক কার্যক্রম, মূল্যস্ফীতি, তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট, প্রশাসনের ওপর আস্থাহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল।

এরমধ্যেই কোটার দাবিতে চলা আন্দোলনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে ১৪ জুলাই। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি কথার সূত্র ধরে শিক্ষার্থীরা মধ্যরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে দলে দলে বেরিয়ে আসেন এবং মিছিলে স্লোগান তোলেন ‘তুমি কে আমি কে—রাজাকার রাজাকার; কে বলেছে কে বলেছে—স্বৈরাচার স্বৈরাচার’, ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’। এর পরদিন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চালানো তাণ্ডব তো সবাই দেখেছে।

সেদিন বাইরে থেকেও প্রচুরসংখ্যক দলীয় কর্মী ও সন্ত্রাসীকে ক্যাম্পাসে আনা হয়। তারা হকিস্টিক, লাঠি, রড, লোহার পাইপসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কারও কারও হাতে পিস্তলও দেখা যায়। ঘটনার সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায় নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকে।

জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আন্দোলনকারী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। অনেক স্থানে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। হাসপাতালগুলোতে আহতদের ভিড় বাড়তে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আহত শিক্ষার্থীদের ছবি, স্বজন হারানো পরিবারের কান্না এবং রক্তাক্ত ভিডিও দেশজুড়ে আবেগ ও ক্ষোভ তৈরি করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার দেশব্যাপী কারফিউ জারি করে। মোবাইল ইন্টারনেট এবং পরে ব্রডব্যান্ড সংযোগও বন্ধ করে দেয়া হয়। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।

সেসময় সরকারের যুক্তি ছিল, রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও আন্দোলন থামেনি। মানুষ মুখে মুখে খবর আদান-প্রদান করেছে, স্থানীয়ভাবে সমন্বয় করেছে এবং নতুন নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

পরিস্থিতির অবনতির সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলের নজর পড়ে বাংলাদেশের দিকে। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ সহিংসতা বন্ধ, সংযম প্রদর্শন এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানায়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করতে থাকে।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক তারিক মনজুর মন্তব্যে বলছেন, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট। ভয়কে জয় করে বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক হয়েছিল গোটা দেশ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো ছাত্র-জনতার বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল স্বৈরাচার পতনের এক দফা—শেখ হাসিনার পদত্যাগ। সেদিন থেকেই ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। মাসজুড়ে চলা বর্বরতা ২০২৪ সালের জুলাইকে পরিণত করেছিল এক শ্রাবণ বিদ্রোহে। ৩ আগস্ট সেই বিদ্রোহের সব ক্ষোভ যেন এক বিন্দুতে মিলিত হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। বৈষম্যের সব শিকল ভেঙে সেদিন এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল সবাই।

এক দফার ঘোষণার অপেক্ষায় ছিল যেন পুরো জাতি

জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন ৩ আগস্ট। সেদিনই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে আসে ঐতিহাসিক এক দফা ঘোষণা। এতে পাল্টে যায় আন্দোলনের গতিপথ এবং তৈরি হয় গণঅভ্যুত্থানের শক্ত ভিত্তি। যদিও সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সমন্বয়কদের জন্য একেবারেই সহজ ছিল না।

২০২৪ সালের ৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে নেমেছিল মানুষের জনসমুদ্র। সেই বিশাল সমাবেশ থেকেই আসে শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি।

নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ জানান, তীব্র দমন-পীড়নের আশঙ্কা মাথায় নিয়েই সেদিন শহীদ মিনারে সমবেত হয়েছিলেন তারা। শুরুতে শেখ হাসিনার পতনের ঐতিহাসিক এক দফা ঘোষণার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতো না কোনো রাজনৈতিক দল।

এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সেসময়কার সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম জানান, ‘আমাদের মূলত সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল, যেন আমরা সরকারের সঙ্গে কোনোভাবেই সহযোগিতা না করি। এর অধীনে ১০-১২টির মতো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ছিল। এই আন্দোলন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়েছে এবং এখানকার লিডারশিপ সম্পূর্ণ স্পষ্ট ছিল। তবে এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সব স্তরের অংশগ্রহণ ছিল। সে সময় কেউ কোনো বিশেষ রাজনৈতিক পরিচয়ে আসেননি; বরং তখন সবাই নিজ নিজ রাজনৈতিক পরিচয় লুকিয়েছে।

এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেন, ‘১৫-২০ জনের মূল সমন্বয়ক দলের ধারাবাহিকভাবে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। আন্দোলনের সেন্ট্রাল ফিগার হিসেবে অর্গানিকভাবেই নাহিদ ইসলামের নাম উঠে এসেছিল। সবার মতও ছিল নাহিদই এক দফা ঘোষণা করবেন। তবে সরকার পতনের এক দফা ঘোষণার বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই একটা সুনির্দিষ্ট ঐক্য বা কনসেন্সাস ছিল। আন্দোলন চলাকালীন এর সঠিক ভাষা বা বক্তব্য কী হবে, তা নিয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যে অনেক আলোচনা করতে হয়েছে।’

ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, ৩ আগস্ট শহীদ মিনারের সেই অভূতপূর্ব জনসমাগম আন্দোলনে এক নতুন গতির সঞ্চার করেছিল। সেখান থেকেই তৈরি হয়েছিল সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচির অভূতপূর্ব জনসমর্থন, যা পরবর্তী সময়ে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের শক্ত ভিত্তি গড়ে দেয়। নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও অর্গানিক আন্দোলনকে সফল করতে সেদিন শহীদ মিনারের চতুর্দিকে ছাত্রশিবিরের হাজার হাজার নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিল। এক দফার ঘোষণার পর পুরো চিত্র বদলে যায়। সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে ৫ আগস্ট সরকার পতন নিশ্চিত করেছে।

একদিন এগিয়ে আনা হয় ‘মার্চ ফর ঢাকা’ কর্মসূচি

আগস্টের শুরুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘোষণা করে ‘মার্চ ফর ঢাকা’ কর্মসূচি। এটি ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে ভয়-ডরহীন সাহসী কর্মসূচি। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ রাজধানীর দিকে রওনা দেন। কেউ বাসে, কেউ ট্রাকে, কেউ মোটরসাইকেলে, আবার অনেকে হেঁটেও ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ব্যারিকেড, যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ এবং নানা বাধা সত্ত্বেও হাজার হাজার মানুষ রাজধানীতে প্রবেশ করতে সক্ষম হন।

আন্দোলনকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা। সেই সময় আর প্রশ্ন ছিল না, কোটা থাকবে কি থাকবে না। প্রশ্ন ছিল, সরকার টিকে থাকবে, নাকি ইতিহাস নতুন মোড় নেবে।

৫ আগস্ট, ২০২৪। সূর্য ওঠার আগেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীমুখী মানুষের ঢল আরও তীব্র হতে শুরু করে। আগের রাতেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ‘মার্চ ফর ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল রাজধানীতে অবস্থান নিয়ে সরকার পতনের দাবিতে চূড়ান্ত কর্মসূচি পালন করা।

সরকারের পক্ষ থেকে রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয়। কোথাও কোথাও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কিন্তু জনস্রোত থামানো যায়নি।

ভোর থেকেই গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদীসহ আশপাশের জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। একই সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীরা ছোট ছোট মিছিল নিয়ে একত্রিত হতে শুরু করেন। সকালের দিকে শাহবাগ, বাংলামোটর, ফার্মগেট, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, নীলক্ষেত, পল্টন, প্রেস ক্লাব, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষের খবরও আসে।

আন্দোলনকারীদের বড় অংশ গণভবন অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক তখন কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয়। অনেকেই জাতীয় সংসদ ভবন এলাকাতেও জড়ো হন। কেউ জাতীয় পতাকা হাতে, কেউ ব্যানার নিয়ে, কেউ আবার খালি হাতে রাস্তায় নামেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, “রাজনৈতিক দলকে দমানো গেলেও জাগ্রত জনতাকে গুলি করে থামানো সম্ভব হয় না। আন্দোলন দমনের নামে নিপীড়ন, সহিংসতার ছবি ও ভিডিও দৃশ্যগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সরাসরি মানুষের চোখের সামনে চলে আসায় যারা রাস্তায় নেমেছিলেন তারা তো বটেই, এমনকি ঘরে বসে থাকা মানুষও তীব্রভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, যা এই গণঅভ্যুত্থানকে আরও বেগবান করে তুলেছিল। আর এটি যে একক কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ছিল না, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, শিক্ষক, অভিভাবক সব শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল তা ৫ আগস্টের রাজধানীর চিত্রই তা প্রমাণ করেছে।”

‘শেখ হাসিনা পালিয়েছে’ খবরে জনতার দখলে রাজপথ, সংসদ ও গণভবন

দুপুরের দিকে রাজধানীতে নানা ধরনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর গণভবনে নেই। প্রথমে বিষয়টি নিশ্চিত না হলেও কিছু সময়ের মধ্যেই দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হতে শুরু করে যে, তিনি সরকারি বাসভবন ত্যাগ করেছেন।

এরপর অল্প সময়ের ব্যবধানে নিশ্চিত হয়, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় উল্লাস শুরু হয়। অনেক মানুষ রাস্তায় নেমে বিজয় মিছিল করেন। আবার কোথাও কোথাও সরকারি ও দলীয় স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।

সরকার পতনের পরপরই শেখ হাসিনার দেশত্যাগ নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। পরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ভারতের সংসদে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির কারণে শেখ হাসিনা খুব অল্প সময়ের নোটিশে ভারতে আসেন। তিনি নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতে অস্থায়ীভাবে অবস্থানের অনুমতি চান এবং ভারত মানবিক বিবেচনায় সেই সুযোগ দেয়।

জয়শঙ্করের ওই বক্তব্যের পর স্পষ্ট হয় সেদিন জীবন বাঁচাতেই পালিয়েছিল শেখ হাসিনা। এ ব্যাপারটিকে প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক হাসান ফেরদৌস চিত্রিত করেছেন এভাবেই যে “হাসিনা ভয় পায় না, হাসিনা পালায় না” বলে পালানো স্বৈরাচারি হাসিনা একা নন। তারও সঙ্গি আছে। পূর্ব জার্মানির এরিক হোনেকার, ইরানের শাহেনশাহ রেজা শাহ পাহলভি, ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস অথবা আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির পাশে। যারা জনতার অভ্যুত্থানে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাজনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শেখ হাসিনার হঠাৎ ক্ষমতার অন্তর্ধান দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার বড় পরিবর্তনের প্রতীক ৫ আগস্ট। শুধু একটি সরকারের পতনের দিন নয়; এটি ছিল একটি দীর্ঘদিনের ক্ষমতা কাঠামো ভাঙ্গার দিন। যেখানে পরিবর্তন, সংস্কারের দাবি ছিল মূল। এমনটি আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো ঘটেনি। ইতিহাসের নতুন বাঁকে বাংলাদেশ যেখানে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার স্বর্তস্ফূর্ত জানান দিয়েছে ছাত্র-জনতা। আন্দোলনের সেই দিনগুলোর স্মৃতি, রক্তাক্ত রাজপথ, শোকাহত পরিবার, হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, ইন্টারনেটবিহীন নিস্তব্ধ শহর, আর রাজপথে নেমে আসা লাখো মানুষের দৃশ্যও মনে করিয়ে দেয় পরিবর্তিত বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার কথা।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম আলী রেজা ঢাকা পোস্টকে বলেন, পুরোনো বন্দোবস্তের বিপরীতে জুলাই আন্দোলন পরিবর্তন-সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে। এটা মানতেই হবে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশকে নতুন বাঁকে দাঁড় করিয়েছে।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পরিণতি মনে করিয়ে দেবে, ভবিষ্যতে চাইলেই গণতন্ত্র মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে ক্ষমতায় থাকা সহজ হবে না। ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের মতোই জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়েও হয়তো বিতর্ক হবে। কারণ যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকে আওয়ামী রেজিমের বিরুদ্ধে আন্দোলনটা হলো সেটা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ইস্পাত কঠিন ঐক্যে শৈথিল্য দেখছি।

সূত্র: ঢাকা পোস্ট

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2011-2020 BanglarKagoj.Net
Theme Developed By ThemesBazar.Com