
বাংলার কাগজ ডেস্ক: বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টা। কক্সবাজারের উখিয়ার খ্যাংখালী স্টেশন পেরিয়ে কিছুটা সামনে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থামায় পুলিশের একটি দল। নেতৃত্বে ছিলেন বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) কিবরিয়া। অটোরিকশা থেকে আটক করা হয় ছৈয়দুল বশর ওরফে ছিছিকে।
তিনি পালংখালীর আঞ্জুমানপাড়ার আব্দুস ছবুরের ছেলে ও ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য। তিনি উখিয়ার শীর্ষ মাদককারবারিদের একজন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, ওই অটোরিকশা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ১৫ কার্ড, অর্থাৎ দেড় লাখ পিস ইয়াবা এবং একটি নাইন এমএম পিস্তল। কিন্তু ঘটনার পরে উখিয়া থানা পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইয়াবা উদ্ধারের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০ হাজার পিসে। পিস্তলের কোনো উল্লেখ নেই সেখানে। এই ঘটনায় এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, উদ্ধার হওয়া ইয়াবার এক লাখ পিস জব্দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, গায়েব করা ইয়াবা পরে মাদক কারবারিদের কাছে বিক্রি করা হয়।
পিস্তলটি জব্দের তালিকায় না রাখার বিনিময়ে আটক ব্যক্তির পরিবারের কাছ থেকেও অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনার মাষ্টার মাইন্ড হিসেবে কাজ করেছেন বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই কিবরিয়া।
উখিয়া থানা-পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেখা গেছে, পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী জোড়া ব্রিজের পশ্চিম পাশে অস্থায়ী চেকপোস্টে তল্লাশির সময় একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থামানোর সংকেত দেওয়া হয়। এ সময় চালকসহ তিনজন পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ ধাওয়া করে ছৈয়দুল বশরকে আটক করে।
অন্য দুজন পালিয়ে যান। পরে অটোরিকশার চালকের আসনের নিচে রাখা একটি সাদা বস্তা থেকে পাঁচটি কার্টনে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। অটোরিকশাটিও জব্দ করা হয় বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা ব্যক্তিদের বর্ণনা পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে মিলছে না।
তাদের ভাষ্য, তাকে থ্যাইংখালী ষ্টেশন থেকে তাকে আটকের সময় ইয়াবার পরিমাণ ছিল দেড় লাখ পিস। এ ছাড়া একটি নাইন এমএম পিস্তলও উদ্ধার করা হয়েছিল।
অভিযোগ আছে, এই এক লাখ পিস আত্মসাতের সাথে এসআই কিবরিয়ার পাশাপাশি এএসআই সজিবুল ইসলাম ও কনেষ্টেবল মোহাম্মদ সুজনের নাম এসেছে।
স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, জব্দের তালিকায় না ওঠা এক লাখ পিস ইয়াবা ঘটনার রাতেই একটি মাদক কারবারি চক্রের কাছে প্রায় এক কোটি টাকায় বিক্রি করা হয়।
এসআই কিবরিয়া নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ফাঁড়ি ও উখিয়ায় দীর্ঘদিন কর্মরত রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এই সময়ে সীমান্তের মাদক পয়েন্ট, কারবারি আর সোর্সদের সবাই তার নখদর্পণে। অভিযোগ আছে, কারবারিদের কাছ থেকে মাসোহারা আর মাদক সরানো তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে এবং সেই আয়ে গ্রামের বাড়িতে স্ত্রী ও স্বজনদের নামে বিপুল সম্পদ গড়েছেন।
উপজেলা ছাত্রদল নেতা মাহবুব আহমদ শাকিল ফেসবুকে লিখেছেন, কিবরিয়া আগেও সীমান্তের চোরাকারবারিদের সহযোগী ছিলেন, এখনো আছেন। স্থানীয় যুবক ওসমান সরওয়ার বলেন, এক লাখ ইয়াবা গায়েবের কথা সত্য; কিবরিয়া নাকি বলে বেড়াচ্ছেন, কেউ তার কিছু করতে পারবে না।
স্থানীয় সাংবাদিক রফিক উদ্দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ইয়াবা উদ্ধারের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে লেখেন, ‘৫০ হাজার নাকি ১ লাখ ৫০ হাজার?’ তার পোস্টের মন্তব্যে কয়েকজন দেড় লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধারের দাবি করেন।
এরআগে ১৭ আগস্ট মাদকবিরোধী র্যালিতে ওসি আতিকুর রহমান গর্জে উঠেছিলেন, ‘হয় মাদক ছাড়ুন, নইলে উখিয়া ছাড়ুন।’ স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই হুংকার ছিল কারবারিদের ভয় দেখিয়ে সুবিধা আদায়ের কৌশল। তাদের দাবি, এরপর উখিয়া ও আশপাশের এলাকায় মাদক কমেনি; এলাকা পরিণত হয়েছে মাদকের অভয়ারণ্যে।
ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় আইনজীবী এডভোকেট জসিম আজাদ। তিনি বলেন, ‘উখিয়া থানা পুলিশের পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে ইয়াবা গায়েবের অভিযোগের খবরটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব মাদক নিয়ন্ত্রণ করা, তাদের বিরুদ্ধেই যদি জব্দ করা ইয়াবা গায়েব করার অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক।’
মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করলেও মাঠপর্যায়ে তার যথাযথ প্রতিফলন ঘটছে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।’
বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই কিবরিয়াকে একাধিকবার ফোন করা হয়। প্রথমদিকে তিনি ফোন ধরেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে লিখিতভাবে অভিযোগগুলো জানিয়ে বক্তব্য চাওয়া হলেও জবাব পাওয়া যায়নি।
পরে প্রতিবেদন তৈরির সময় আবার ফোন করা হলে তিনি বলেন, আপনি কী জন্য ফোন দিয়েছেন, আমি জানি। এই বিষয় নিয়ে গতকাল থেকে অন্তত ৫০টি কল পেয়েছি। আপনারা তদন্ত করে যা পান, তা লিখেন।
তবে উদ্ধার হওয়া এক লাখ পিস ইয়াবা গায়েব, পিস্তল জব্দের তালিকায় না রাখা কিংবা অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, আমি গত চার দিন থানায় ছিলাম না, ছুটিতে ছিলাম। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে তা তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হবে। তবে আমাকে জড়িয়ে যারা এ ধরনের প্রচার করছেন, তারা অপরাধ করছেন। আমরা এখানে মাদক নির্মুল করতে এসেছি।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. অহিদুর রহমান বলেন, আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনাদের কাছে কোনো তথ্য-উপাত্ত থাকলে তা দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করবেন।
তিনি আরও বলেন, সাধারণত বিজিবি কিংবা অন্যান্য কোন বাহিনী মাদক জব্দ করলে ঢালাওভাবে এভাবে অভিযোগ প্রচার করেনা। পুলিশ কোনো অভিযান পরিচালনা করলেই এ ধরনের অভিযোগ ওঠে।
এ কারণে উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় দায়িত্ব পালন করতে অনেক কর্মকর্তা আগ্রহী হন না। এমনকি অভিযান পরিচালনা করতেও অনেকে ভয় পান। তারপরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।