
বান্দরবান : যে ঝিড়ির স্বচ্ছ পানিতে একসময় গ্রামের মানুষ গোসল করতেন, রান্নাবান্না ও গৃহস্থালির কাজ সারতেন, সেই ঝিড়ির পানি এখন প্লাস্টিক, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ইনজেকশনের সূঁচ, সালাইনের ব্যাগসহ বিভিন্ন মেডিকেল বর্জ্যে দূষিত। দুর্গন্ধ, দূষিত পানি ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বর্জ্যে নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমি। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বান্দরবান সদর উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের লেমুঝিড়ির আগা ঘোনা পাড়ায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ঝিড়ির পানির সঙ্গে নেমে আসা পৌরসভার বিভিন্ন বর্জ্য বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতে ছড়িয়ে রয়েছে। কোথাও প্লাস্টিকের স্তূপ, কোথাও মেডিকেল বর্জ্য, আবার কোথাও মাটির ভেতর থেকে বেরিয়ে আছে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ভাঙা কাঁচ ও ধারালো বর্জ্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ৬ থেকে ১৩ জুলাই টানা অতিভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার সময় বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কের পাশের পৌরসভার অস্থায়ী বর্জ্যস্তুপে জমে থাকা ময়লা এক্সকাভেটর দিয়ে পাশের লেমুঝিড়িতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে বন্যার পানিতে সেই বর্জ্য ভেসে নিচের কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের দাবি, শুধু এবার নয়, গত কয়েক বছর ধরেই বর্ষাকালে একইভাবে পাহাড়ের ঢালে ফেলা বর্জ্য নিচের কৃষিজমিতে নেমে আসে। তবে এবারই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। এতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ একর তিন ফসলি কৃষিজমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
ভুক্তভোগী কৃষক সুমন বড়ুয়া বলেন, এখন জমিতে নামাও ঝুঁকিপূর্ণ। চাষ করতে গেলেই মাটির নিচে প্লাস্টিক, ইনজেকশনের সূঁচ, সিরিঞ্জ ও ভাঙা কাঁচ পাওয়া যায়। এসব কারণে জমিতে কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
আরেক কৃষক সুজাতা তনচঙ্গ্যা বলেন, বর্জ্যের কারণে আমার প্রায় এক একর আড়াই কানি জমিতে নিয়মিত চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। একইভাবে সিত্তি রঞ্জন তনচঙ্গ্যা, আদরময় তনচঙ্গ্যা ও শান্তিময় তনচঙ্গ্যার কৃষিজমিও দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

শুধু কৃষিজমিই নয়, দূষণের কারণে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে ঝিড়ির পানিও।
স্থানীয় বাসিন্দা মোবিনা বেগম বলেন, আগে এই ঝিড়ির পানিতে গোসল, রান্নাবান্না ও গৃহস্থালির সব কাজ করতাম। এখন পানিতে নামলেই শরীরে চুলকানি শুরু হয়, বড় বড় গুটি ওঠে। এই পানি এখন আর কোনো কাজেই ব্যবহার করা যায় না।
পৌরসভার বর্জ্যের প্রভাব পড়েছে এলাকার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও। লেমুঝিড়ি আপন নগর জ্ঞানদর্শন-বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রের অধ্যক্ষ জ্ঞানদ্বীপ ভিক্ষু বলেন, গত দুই-তিন বছর ধরে বিহারের পাশের পাহাড়ে পৌরসভার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। বর্ষা হলেই সেই বর্জ্য ধানক্ষেতে চলে আসে। দুর্গন্ধে বিহারে ধ্যান, ভাবনা, আহার ও বসবাস কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
এলাকার সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, উন্মুক্ত স্থানে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে ওই সড়ক দিয়ে চলাচলও দিন দিন কষ্টকর হয়ে উঠছে। বিশেষ করে মেডিকেল বর্জ্য উন্মুক্তভাবে ফেলে রাখায় আশপাশের কৃষিজমি, ঝিড়ির পানির উৎস, জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত নিরাপদ স্থানে বর্জ্য অপসারণ, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
এ বিষয়ে পৌরসভার বর্জ্য অপসারণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা দিদারুল হক চৌধুরী বলেন, লেমুঝিড়ির আগা ঘোনা পাড়া পৌরসভার সীমানার বাইরে। যেখানে ধানের জমিতে বর্জ্য পড়েছে, সেটির দায় জেলা প্রশাসনের। প্রয়োজন হলে সরকারি বরাদ্দ এনে বর্জ্য অপসারণ করতে হবে।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, গত বর্ষায় পৌরসভার অস্থায়ী বর্জ্যভাগার থেকে এক্সকাভেটর দিয়ে বর্জ্য ধানের জমির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দিদারুল হক চৌধুরী বলেন, বিষয়টি পৌর প্রশাসকের নির্দেশে সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। বন্যার সময় কর্মীদের ধানের জমিতে বর্জ্য ফেলতে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
বান্দরবান পৌর প্রশাসক এস. এম. মঞ্জুরুল হক বলেন, পৌরসভার বর্জ্যে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়ার পরই ঘটনাস্থল পরিদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জমিতে থাকা বর্জ্য কীভাবে অপসারণ করা যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমি আবার কীভাবে চাষযোগ্য করা যায়, সে বিষয়ে কাজ চলছে।