
নাটোর: ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম (২৮) হত্যাকণ্ডে জড়িত সন্দেহে নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের বড় ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে আটক করেছে নাটোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত দশটার দিকে গুরুদাসপুর বাজার সংলগ্ন ভাড়া বাড়ি থেকে আটক করা হয় তাকে।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মো. নজরুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এমপি পুত্র মিন্টুকে ডিবি হেফাজতে রাখা হয়েছে। সোমবার দিবাগত রাতে থানা পুলিশ মিন্টুকে আটক করে রাত ১২টার দিকে ডিবির কাছে হস্তান্তর করে। এমপিপুত্র মিন্টুকে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে নিবিড় ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক সূত্রে জানা যায়, দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ১২ দিন চিকিৎসার পর সোমবার রাত সাড়ে আটটার দিকে মারা যান। মৃত্যুর খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর সেই হাসপাতালেই কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতির নেতৃত্বে এমপি আবদুল আজিজকে অবরুদ্ধ করা হয়।
সেখানে তার বড় ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেপ্তার ও নিহত শাকিলের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান নেতাকর্মীরা। সেই দাবির প্রেক্ষিতেই রাত দশটার দিকে মিন্টুকে আটক করে মধ্যরাত পর্যন্ত গুরুদাসপুর থানায় ওসির কক্ষে বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবদের জন্য রাতেই তাকে নাটোর জেলা বিডি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। তবে এসব ঘটনার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে আজ সকালে শাকিলের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে যান নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ। তিনি বলেন, অপ্রত্যাশিত এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সন্তান জড়িত থাকলেও বিচারের কাঠগড়ায় আর করানো হবে।
এ সময় সংসদ সদস্য ও ওসির উপস্থিতিতে নিহত শাকিলের পিতা রবিউল করিম অপরাধীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অবহেলার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ঘটনার পর থেকে আসামি ধরতে পুলিশের চরম অবহেলা ছিল। স্থানীয় নেতা কর্মীরাও এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখেননি। তিনি মামলার এজাহারে নাম উল্লেখ করে দিলেও এজাহারটি অজ্ঞাতনামা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।
নিহত শাকিল ইসলাম গুরুদাসপুর পৌরসভার খামার নাচকৈড় খোয়ারপাড়া এলাকার রবিউল করিমের ছেলে। তিনি গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব ছিলেন। গত ১৪ অক্টোবর রাতে চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হামলার শিকার হন। দুর্বৃত্তরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করেছিলেন। এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর গুরুদাসপুর থানায় অজ্ঞাত নামা আসামি করে একটি মামলা করেছিলেন তার বাবা রবিউল করিম।
পুলিশ ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হেলমেট পরা সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন ছাত্রদল নেতা শাকিল। এ সময় শাকিলকে কুপিয়ে জখম করে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যান হামলাকারীরা।
সেদিন হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বেডে শুয়ে শাকিল বলেছিলেন, চাঁচকৈড় বাজার থেকে রাত ৯টার দিকে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন। বাজারপাড়া এলাকার নুর একাডেমির কাছে পৌঁছালে হেলমেট পরা দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুলি থেকে বাঁচতে দৌড় দেন। গুলি গায়ে না লাগায় দুর্বৃত্তরা তার পেছনে ধাওয়া করে। পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দুলাল সরকারের বাড়ির সামনে আসলে দুর্বৃত্তরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। এ সময় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসার আগেই মোটরসাইকেল নিয়ে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী সুমন রহমান জানান, বাজারপাড়ার শহীদা জলিল স্কুলের কাছে পর পর দুটি গুলি শব্দ শুনতে পান তারা। এগিয়ে যেতেই শাকিলকে দৌড়ে চলে যেতে দেখেন। পেছনে মোটরসাইকেল নিয়ে ধাওয়া করে দুই ব্যক্তি। কিছুক্ষণ পর রক্তমাখা অস্ত্র নিয়ে হামলাকারীদের ফিরতে দেখেন। পরে শহীদা জলিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে চিৎকার করছিলেন শাকিল। তারা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
গুরুতর আহত অবস্থায় শাকিলকে উদ্ধার করে প্রথমে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর রাতেই উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহীতে পাঠানো হয়।
গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক নওশিন জাহান বলেন, ‘গুরুতর অবস্থায় তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত করা হয়। শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় চিকিৎসা শেষে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’
যুবদল নেতা ইসরাফিল শেখ বলেন, ‘হামলার রাতেই রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে শাকিলকে অন্তত পাঁচ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়। এরপর অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অপারেশনের পর অবস্থার অবনতি হলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাকিলের কিডনি কাজ করছিল না। শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় ওই হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে নেওয়া হয়। আইসিইউতে রাখার পর লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। সবশেষ সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে চিকিৎসকরা শাকিলকে মৃত ঘোষণা করেন।’
এ বিষয়ে নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইফতেখার আলম বলেন, আমরা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে রাতে নিয়ে আসছি। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।