
আসিফ আমানুল্লাহ, স্টাফ রিপোর্টার: ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা গারো পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি, পাহাড়ি পথ আর বন্য হাতির বিচরণ—সব মিলিয়ে শেরপুরের পাহাড়ি জনপদ হয়ে উঠেছে পর্যটকদের আকর্ষণের জায়গা। জেলার নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসুরা। বিশেষ করে শীত মৌসুম ও ঈদের ছুটিতে পর্যটকের ভিড় বাড়ে।
তুলশীমালার সুগন্ধে, পর্যটনের আনন্দে স্লোগান ধারণকৃত এই জেলায় অসংখ্য দৃষ্টিনন্দন দর্শনীয় স্থান রয়েছে।
শেরপুরের উল্লেখযোগ্য পর্যটনকেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে, ঝিনাইগাতীর গজনী অবকাশ, রাবার বাগান ও শালবন, ঘাগড়া লস্কর বাড়ি মসজিদ, নালিতাবাড়ীর মধুটিলা ইকোপার্ক, পানিহাটা তারানী পাহাড়, বারোমারি ও পানিহাটা খ্রিস্টান মিশন, দাওধারা গারো পাহাড় পর্যটন কেন্দ্র, নাকুগাঁও স্থলবন্দর, সুতানাল পুকুর, শ্রীবরদীর হাড়িয়াকোনা পাহাড়, নয়াবাড়ির টিলাবৈশা বিল ও মাদারপুর মায়াবী লেক, কর্ণঝোড়া রাজার পাহাড়, গড়জরিপা বারদুয়ারী মসজিদ এবং শের আলী গাজীর মাজার,তিন আনি জমিদার বাড়ি, মাইসাহেবা জামে মসজিদ, বাড়িকসবা মোঘল মসজিদ, রঘুনাথ জিউর মন্দির ও নরসিংহ জিউর ইত্যাদি।
জেলার তিন উপজেলায় পাহাড়ের উঁচু-নিচু পথে ঘুরতে গেলে দেখা যায় ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা।
পর্যটনের পাশাপাশি গারো পাহাড়ের আরেক আকর্ষণ বন্য হাতি। এ অঞ্চলের পাহাড় ও বনে প্রায়ই হাতির পাল দেখা যায়। স্থানীয়দের হিসাবে, পুরো গারো পাহাড় এলাকায় দুই শতাধিক ছোট-বড় বন্য হাতি রয়েছে।
গারো, কোচসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি, পোশাক, খাবার ও জীবনযাপনও পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। পাহাড়ি এলাকার আনারস, কলা, কমলা, লটকন, আদা ও হলুদসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যও পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়।
এখানকার গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মাঝে মধুটিলা ইকোপার্ক ও গজনী অবকাশ শীর্ষে রয়েছে।
মধুটিলা ইকোপার্কে সংস্কারের দাবি: নালিতাবাড়ীর পোড়াগাঁও ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রায় ৩৮৩ একর জায়গাজুড়ে ১৯৯৯ সালে মধুটিলা ইকোপার্ক ঘোষণা করা হয়। এখানে কৃত্রিম লেক, ওয়াচ টাওয়ার, মিনি চিড়িয়াখানা, পিকনিক স্পট ও শিশুদের খেলার জায়গা রয়েছে। প্রায় ২০ একর জায়গাজুড়ে রয়েছে ঔষধি গাছের বাগান।
তবে দীর্ঘদিনের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, বিনোদন রাইড অকেজো থাকা, খাবার ও রাতযাপনের ভালো ব্যবস্থা না থাকা নিয়ে পর্যটকদের অভিযোগ রয়েছে। বন্য হাতির উপদ্রবসহ নিরাপত্তা নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে।
দর্শনার্থী খন্দকার জান্নাতুল ইসলাম ও আব্দুল্লাহ আল আমিন, পারভেজ , মুখলেছ বলেন, ‘মধুটিলা ইকোপার্কে অনেক কিছুই রয়েছে দেখার মতো। তবে এগুলোর আরও সংস্কার প্রয়োজন।’
বনবিভাগের মধুটিলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (সদ্য বদলিকৃত) দেওয়ান আলী বলেন, পর্যটকদের নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে বন বিভাগ কাজ করছে। ইকোপার্কের বিভিন্ন সমস্যা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সমাধানের চেষ্টা চলছে। কিছু সংস্কারকাজ হয়েছে, আরও সংস্কারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
গজনীতে বাড়ছে পর্যটক: ঝিনাইগাতী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা গারো পাহাড়ের পাদদেশে গজনী অবকাশ কেন্দ্র। জেলা শহর থেকে প্রায় ২৮–৩০ কিলোমিটার দূরের প্রায় ৯০ একর জায়গার এ পর্যটনকেন্দ্রটি ১৯৯৩ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গড়ে ওঠে। এখানে মিনি চিড়িয়াখানা, টিলা, লেক, কৃত্রিম জলপ্রপাত, ঝুলন্ত সেতু, ওয়াচ টাওয়ার, প্যাডেল বোট, শিশু পার্ক , পাহাড় ও বন রয়েছে। এখানকার খাবারের দোকানে পাহাড়ি বুনো মুরগি, শুঁটকি ভর্তা, পিঠাসহ নানা দেশীয় খাবার পাওয়া যায়। থাকার জন্য রয়েছে বনরাণী ফরেস্ট রিসোর্ট। এ ছাড়া সরকারি অনুমতি নিয়ে উপজেলা ডাকবাংলো ও বন বিভাগের রেস্ট হাউসে থাকা যায়।।
দর্শনার্থী হাসান মিয়া, কাওসার, ও হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘গজনী অবকাশের সৌন্দর্য দেখে ভালো লেগেছে। এখানে এলে মন ভালো হয়ে যায়।’
হাড়িয়াকোনা পাহাড়ে নতুন সম্ভাবনা: পাহাড়, সবুজ বন আর সীমান্তঘেঁষা নৈসর্গিক সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে শ্রীবরদী উপজেলার হারিয়াকোনা যেন প্রকৃতির নিজ হাতে সাজানো। পর্যটনের কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই, নেই ভালো রাস্তা বা বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা। তবুও প্রকৃতির টানে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী ছুটে আসছেন এখানে।
শেরপুর জেলা সদর থেকে প্রায় ৪৪ কিলোমিটার ও শ্রীবরদী উপজেলা শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে ভারতের সীমান্তঘেঁষা হারিয়াকোনা। গারো পাহাড়ের অন্যান্য টিলার তুলনায় এখানকার টিলাগুলো বেশ উঁচু—প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ ফুট। পাহাড়ের ঢালে সুপারি ও রাবারবাগান, পাশে ভারতীয় পাহাড় ও কাঁটাতারের বেড়া—সব মিলিয়ে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।
স্থানটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে হওয়ায় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেই, তবে রয়েছে সম্ভাবনা। প্রকৃতির ভারসাম্য অক্ষুণ্ন রেখে যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হলে হারিয়াকোনা শেরপুরের পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। দর্শনার্থী প্রতীক ও শামীম বলেন, এখানে আসলে মন ভরে যায়, চমৎকার সব প্রাকৃতিক দৃশ্য হৃদয় ভরে দেয়।
গারো পাহাড়ে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক সড়ক সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ। পর্যাপ্ত আবাসন, শৌচাগার, পার্কিং, রেস্তোরাঁ, পর্যটক তথ্যকেন্দ্র ও জরুরি চিকিৎসাসেবার ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেক পর্যটক দিনের মধ্যেই ফিরে যান।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন, হস্তশিল্প ও স্থানীয় কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হবে। এতে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও গতি আসবে
শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন দৈনিক জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘গারো পাহাড়ঘেরা শেরপুরে পর্যটকদের নজর কাড়ার মতো অনেক প্রাকৃতিক স্থান রয়েছে। বিশেষ করে গজনী অবকাশকে আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়েছে। জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা বাড়াতেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এখানে টুরিস্ট পুলিশ না থাকার বিষয়টিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’