
রাঙামাটি: রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বড়থলি ইউনিয়ন যেন দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এক জনপদ। এক পাশে ভারতের মিজোরাম, অন্য পাশে মিয়ানমারের চিন রাজ্য। চারদিকে দুর্গম পাহাড় ও বন। ২৪টি গ্রামের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের এই ইউনিয়নে নেই মাধ্যমিক বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক। স্থায়ী বাজারও নেই। নাগরিক সেবা পেতে হলে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে প্রায় ২৭ কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয়।
মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই, ঝরে পড়ে শিক্ষার্থীরা
পুরো ইউনিয়নে রয়েছে নয়টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। ফলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পরই অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে।
কেউ কেউ হ্রদ পেরিয়ে পাশের ইউনিয়নের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও বর্ষায় তাদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। পাহাড়ি ছড়া ও নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় তখন শিক্ষার্থীদের যাতায়াত হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ।
বড়থলির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পলথনপাড়ার কারবারি মতি ত্রিপুরা বলেন, ‘আমাদের অনেক বাচ্চা পড়তে চায়। কিন্তু বর্ষায় পাহাড়ি ঝরনা আর নদীর পানি বাড়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিশুদের স্কুলে পাঠানো যায় না। সপ্তাহের পর সপ্তাহ পড়াশোনা বন্ধ থাকে।’
তিনি বলেন, পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে। ইউনিয়নে সরকারি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হলে বাসিন্দারা উপকৃত হতেন।
উপজেলা সদরে যেতে লাগে দুই দিন
বড়থলি ইউনিয়নের বাসিন্দাদের জন্য রাঙামাটি জেলা সদরে যাওয়া আরও কঠিন। এমনকি বিলাইছড়ি উপজেলা সদরে যেতেও সময় লাগে প্রায় দুই দিন। তুলনামূলকভাবে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় যাওয়া সহজ; সেখানেও পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় এক দিন।
কোনো প্রয়োজনীয় সেবা বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আনতে বাসিন্দাদের প্রায় ২৭ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ হাঁটতে হয়। বাজারে কেনাকাটা করতে যাওয়া-আসাতেই অনেকের দুই দিন কেটে যায়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ও ১২৪ নম্বর নাড়াইছড়ি মৌজার হেডম্যান শান্তি বিজয় চাকমা বলেন, ‘বড়থলি ইউনিয়নটি অত্যন্ত দুর্গম। বিলাইছড়ি সদরে আসতে আড়াই থেকে তিন দিন লাগে। ন্যূনতম নাগরিক সেবা পেতেই মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।’
বড়থলি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জামাইয়া তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ইউনিয়নে প্রায় ২ হাজার ১০০ ভোটার ও প্রায় পাঁচ হাজার জনসংখ্যা রয়েছে। কিন্তু কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা চিকিৎসাকেন্দ্রে সুব্যবস্থা নেই।
তার ভাষায়, ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয়ও অন্য জেলায়, ২৭ কিলোমিটার দূরে। ফলে সেবা নিতে বা দিতে হলে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। বাজারে কেনাকাটা করতেও যাতায়াতেই চলে যায় দুই দিন।
স্থাপিত নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রমও বন্ধ
বড়থলির দুর্গমতার কারণে সরকারি উদ্যোগেও সেবার পরিধি বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেখানে একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল। তবে দুর্গমতা ও শিক্ষার্থী-সংকটের কারণে আপাতত এর কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।
বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘এলাকাটি খুবই দুর্গম। যোগাযোগ সহজ হওয়ায় বান্দরবানের রুমা উপজেলায় বড়থলি ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয় থেকে প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানো হয়।’
তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেখানে একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল। তবে দুর্গমতা ও শিক্ষার্থী-সংকট থাকায় আপাতত এর কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।
পাহাড়, বন আর সীমান্তঘেঁষা এই ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের জীবন তাই এখনো নির্ভর করছে দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া, জুমচাষ এবং সীমিত স্থানীয় ব্যবস্থার ওপর। শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য নাগরিক সেবা পাওয়ার জন্য তাদের প্রতিনিয়ত পাড়ি দিতে হচ্ছে দীর্ঘ পাহাড়ি পথ।
সূত্র: প্রথম আলো