
বান্দরবান প্রতিনিধি: বান্দরবানের সাত উপজেলায় থাকা ৮১টি করাতকলের মধ্যে ৩৬টিরই বন বিভাগের লাইসেন্স নেই। একই সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই প্রায় অর্ধশত করাতকলের। বছরের পর বছর ধরে এসব করাতকলের অনেকগুলো আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনার পাশে চললেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি নিয়ে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবানে ৪৫টি করাতকলের পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টির ছাড়পত্র নবায়ন করা হয়েছে। বাকি ১০টির ছাড়পত্র নবায়ন করা হয়নি।
অন্যদিকে বন বিভাগের হিসাবে, জেলায় ৮১টি করাতকলের মধ্যে মাত্র ৪৫টির লাইসেন্স রয়েছে। বাকি ৩৬টি করাতকল সম্পূর্ণ অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, করাতকল স্থাপন ও পরিচালনা বিধিমালা, ২০১২ অনুযায়ী সরকারি অফিস, আদালত, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য সংবেদনশীল স্থাপনা থেকে নির্ধারিত দূরত্ব বজায় রেখে করাতকল স্থাপন করতে হয়। বিধিমালায় এসব স্থাপনা থেকে নির্ধারিত দূরত্ব বজায় রাখার বিধান রয়েছে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বান্দরবানের অনেক করাতকলই জনবসতিপূর্ণ এলাকার ভেতরে, স্কুল-মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশে এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কাছাকাছি স্থাপন করা হয়েছে। এতে একদিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে গাছ কাটার ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে করাতকলের শব্দদূষণ, কাঠবাহী ভারী যানবাহনের চলাচল এবং কাঠের বর্জ্যের কারণে পরিবেশ ও জনজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বান্দরবান বিভাগীয় বন বিভাগের আওতায় রয়েছে ১৩টি করাতকল। এর মধ্যে সদর রেঞ্জে ৮টি, সেকদু রেঞ্জে ৩টি এবং থানচি রেঞ্জে ২টি। এছাড়া পাল্পউড প্ল্যান্টেশন বিভাগের অধীনে রয়েছে আরও ৮টি করাতকল।
অন্যদিকে লামা বিভাগীয় বন বিভাগের আওতায় রয়েছে ৬০টি করাতকল। এর মধ্যে লামা উপজেলায় ২১টি, আলীকদমে ৯টি এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ৩০টি।
সরেজমিনে দেখা যায়, বান্দরবান পৌরসভার উজানীপাড়া এলাকায় একটি এবং বালাঘাটা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অন্তত সাতটি করাতকল চলছে। এসব করাতকল জনবসতিপূর্ণ এলাকা, মহিলা কলেজ ও সরকারি স্থাপনার আশপাশে অবস্থিত।
তবে অধিকাংশ করাতকল মালিক তাঁদের প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, লাইসেন্স কিংবা পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। কয়েকটি করাতকলের কর্মচারীরাও জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাঁরা কিছু জানেন না।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব করাতকলের সঙ্গে সাবেক কমিশনার নাসির উদ্দীনের ভাগনে আতিকুর রহমান সানি, আবুল বসর, মোরশেদ কোম্পানি, সাবেক পৌর কাউন্সিলর মোহাম্মদ কামাল, সাবেক পৌর চেয়ারম্যান আয়ুব চৌধুরী, মো. আনোয়ার ও মো. রফিকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি করাতকল বর্তমানে অন্য ব্যক্তিরা পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে।
উজানীপাড়া এলাকার বাসিন্দা মংহ্লাচিং মার্মা বলেন, উজানীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেয়াল ঘেঁষেই একটি করাতকল চলছে। দিন-রাত শব্দদূষণ হচ্ছে। কোমলমতি শিশুদের যাতায়াতের পথ দিয়েই ভারী ট্রাক চলাচল করে। এতে শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়দের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
আরেক বাসিন্দা ক্যসাইনুং মার্মা বলেন, আমাদের ভবনের পাশেই উজানীপাড়ার মধ্যে করাতকলটি চলছে। প্রতিদিন পাড়ার রাস্তা দিয়ে ভারী ট্রাক চলাচল করে। শব্দ ও পরিবেশদূষণের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। দিনের বেলাতেও করাতকলের শব্দের কারণে স্বাভাবিক কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
করাতকল মালিক সমিতির সভাপতি মো. রফিক বলেন, আমরা বন বিভাগ থেকে লাইসেন্স নিয়েছি এবং এ বছরও নবায়ন করেছি। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি।
বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, নিয়ম মেনে লাইসেন্স নবায়ন এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য করাতকল মালিকদের বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও অনেকে তা মানছেন না।
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নুর হাসান সজীব বলেন, জেলায় ৪৫টি করাতকলের পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টি নবায়ন করা হয়েছে। বাকি ১০টি নবায়ন করা হয়নি।
অবৈধ করাতকলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জেলায় যতগুলো অবৈধ করাতকল রয়েছে, সবগুলোকে নোটিশ দেওয়া হবে। আইনগত প্রক্রিয়া মেনে করাতকল চালাতে হবে। তা না হলে অবৈধ করাতকলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লামা বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বারবার বলার পরও আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ির অনেক করাতকলের মালিক লাইসেন্স নেননি। খুব শিগগিরই যারা লাইসেন্স নবায়ন বা পরিবেশগত ছাড়পত্র নেবেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়।