– মনিরুল ইসলাম মনির –
প্রেসক্লাব, নালিতাবাড়ী, শেরপুর এর যাত্রার শুরুটা ১৯৯২ সালে। এর প্রধান উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা সামেদুল ইসলাম তালুকদার। তার সভাপতিত্বে প্রায় ১২ বছর পথচলার পর ২০০২ সালে এর সভাপতি মনোনীত হন এমএ হাকাম হীরা। প্রায় ১৮ বছর শ্রদ্ধেয় এমএ হাকাম হীরা ভাই ও গোপাল চন্দ্র সরকারের নেতৃত্বে চলে প্রেসক্লাব। এরপর দুই বছরের অধিক সময় সভাপতি এমএ হাকাম হীরা ভাই এবং সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব দে কেটু দা’র নেতৃত্বে চলে প্রেসক্লাব।
বলাই বাহুল্য, সাংবাদিকতায় আমার প্রবেশ ২০০২ সালের আগস্টে। এর আগে ১৯৯৮ থেকে এম. সুরুজ্জামান ভাই, আমিরুল ইসলাম ভাই, মরহুম মাহফুজুর রহমান সোহাগ ভাই, আমার পরপরই আব্দুল মান্নান সোহেল ভাই, রাকিবুল ইসলাম রাকিব, আব্দুল মোমেন, আমিনুল ইসলামসহ একঝাঁক তরুণ সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন। দুঃখের বিষয় হলো, একমাত্র সোহেল ভাই ব্যতীত আর কেউ প্রেসক্লাবের সদস্য পদ নিতে পারেননি। অথচ দৈনিক আমার দেশ, নয়াদিগন্ত, আমাদের সময়, মানবজমিন, যায়যায়দিন ও দিনকাল এর মতো ভালো ভালো গণমাধ্যমে কাজ করছিলাম আমরা। তবে ওই সময় স্থানীয়ভাবে কবি, গীতিকার বা হোমিও ডাক্তাররাও শুধুমাত্র আইডি কার্ড এনে এ প্রেসক্লাবের সদস্য হয়েছেন ‘খাতির’ কোটায়। অনেকবার তৎকালীন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদের কাছে ধর্ণা দিয়ে এমনকি বারবার আবেদন করেও মেলেনি আমাদের সদস্য পদ। যদিও সাংবাদিকতা করতে প্রেসক্লাবের অন্তর্ভূক্ত হওয়া জরুরী নয়। এটি সম্পূর্ণই স্বাধীন পেশা। কিন্তু কখনো কখনো নানা সময় আমাদের বলা হতো, আমরা প্রেসক্লাবের কেউ না। এ নিয়ে আমরা সামাজিকভাবে বিব্রত হতাম মাঝেমধ্যেই।
যাই হোক, নানা প্রেক্ষাপটে একসময় প্রেসক্লাব দাড়ায় তিনটি। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসে একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরী অনুভব করলেন সাংবাদিকরা। দুই দফায় ৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল আমরা বসি এবং গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করি। একীভূত প্রেসক্লাব এবং গঠনতন্ত্র তৈরির ওই প্রতিনিধি দলে যারা ছিলেন তারা হলেন- এমএ হাকাম হীরা, সামেদুল ইসলাম তালুকদার, গোপাল চন্দ্র সরকার, লাল মোহাম্মদ শাহজাহান কিবরিয়া, বিপ্লব দে কেটু, মঞ্জুরুল আহসান, আব্দুল মান্নান সোহেল, মনিরুল ইসলাম মনির (আমি), সাইফুল ইসলাম ও জাহাঙ্গীর আলম তালুকদার। মূলত এই দশজন হলেন প্রেসক্লাবের সংবিধান প্রণেতা। প্রথমবারের মতো ২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এক জাঁকজমকপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় আমাদের মাঝে। ওই নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রার্থী হন আব্দুল মান্নান সোহেল ও লাল মোহাম্মদ শাহজাহান কিবরিয়া। সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হই আমি নিজে, মাহফুজুর রহমান সোহাগ, জাহাঙ্গীর আলম তালুকদার, মঞ্জুরুল আহসান, বিপ্লব দে কেটু ও সাইফুল ইসলাম। তবে নির্বাচনের একদিন আগ পর্যন্ত ভোটের অবস্থা বিবেচনা করে মাহফুজুর রহমান সোহাগ ভাই, জাহাঙ্গীর আলম তালুকদার সাধারণ সম্পাদকের প্রার্থীতা নিজ থেকে প্রত্যাহার করে দু’জনই সহ-সভাপতি পদে প্রার্থী হন। নির্বাচনের দিন দুপুরে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেন মঞ্জুরুল আহসান। থেকে গেলাম আমি, বিপ্লব দে কেটু ও সাইফুল ইসলাম।
যে কথা না বললেই নয়, মঞ্জুরুল আহসান তার প্রার্থীতা প্রত্যাহারের কয়েকদিন আগে গোপাল চন্দ্র সরকারসহ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এ নিয়ে গোপনে আলাদাভাবে বসেন এবং মঞ্জুরুল আহসান তাদের দলের বিধায় প্রেসক্লাবের নেতৃত্বে আনার হিসাব কষেন। তবে তখন দলীয় নেতৃবৃন্দ সরাসরি প্রেসক্লাবে প্রভাব বিস্তার করেননি বা কন্ট্রোল করেননি। তারা ভোটারদের নিয়ে আলোচনা করে লবিং করেছেন। এসময় সর্বোচ্চ দুটি ভোট পেতে পারেন, এই আশঙ্কায় দলীয় নেতৃবৃন্দ মঞ্জুরুল আহসান মামাকে বসিয়ে দেন। যেহেতু আমি দল যাই সমর্থন করি, সাংবাদিকতায় মোটামুটি সবার সাথে সু-সম্পর্ক বিবদমান ছিল। তাই আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ অনেক হিসাব কষে বিজয়ী হওয়ার মতো বিকল্প কাউকে না পেয়ে আমার প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন। একইভাবে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, সরকারী বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও আমাকে নির্বাচিত করার পেছনের নানা কৌশলে সহকর্মীদের সাথে কথা বলেছেন। আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি নির্দিষ্ট কোন দলের প্রতিনিধি ছিলাম না। সবার পছন্দের ছিলাম।
আপনারা সবাই জানেন, নালিতাবাড়ীতে কর্মরত নতুন-পুরাতন মিলে বিএনপি ঘরানার সাংবাদিক বর্তমানেও রয়েছেন ৭ থেকে ৮ জন। জামায়াতের ঘরানার রয়েছেন ৬ জনের মতো। বর্তমানে প্রায় ৪৫-৫০ জনের মতো গণমাধ্যমকর্মীর মাঝে বাকী সবাই কোন না কোনভাবে কেউ সরাসরি আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছেন এখনো, কেউ বা তাদের ঘারানার। আবার আমার হাত ধরে বা সহযোগিতায় নতুন নতুন সংবাদকর্মীর আগমনে এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে এখনো পর্যন্ত আমার সমর্থকের সংখ্যা বেশি। যার ফলে নির্বাচনে যে কোন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো সৎ সাহস আমার ছিল, আছে এবং থাকবে।
বলে রাখা ভালো, কোন দলের ঘরাণার সাংবাদিকতা করা যাবে না বা ভালো নয়, তা কিন্তু নয়। মত-পথ থাকবেই। কিন্তু পদে থেকে দলনিরেপক্ষ থাকা অসম্ভব বলেই আমি এক সময় দলীয় পদের প্রয়োজনীয়তা হারাই।
যাই হোক, ২০২২ সালের ১৪ ফেবুয়ারি নির্বাচনে সভাপতি পদে বিজয়ী হন আব্দুল মান্নান সোহেল এবং সাধারণ সম্পাদক পদে আমি মনিরুল ইসলাম মনির। মোট ২৮ ভোটের মধ্যে আমার প্রাপ্ত ভোট ছিল ১৫, বিপ্লব দে কেটু দা’র প্রাপ্ত ভোট ছিল ৮ এবং সাইফুল ইসলাম ভাইয়ের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৫। এরমধ্যে সাধারণ সম্পাদক পদে হেরে যাওয়া সাইফুল ইসলাম, সভাপতি পদে হেরে যাওয়া লাল মোহাম্মদ শাহজাহান কিবরিয়া, সহ-সভাপতি পদে হেরে যাওয়া আমিনুল ইসলাম ও সহসভাপতি নির্বাচিত জাহাঙ্গীর আলম তালুকদার শপথ ভঙ্গ করে প্রেসক্লাব থেকে বেরিয়ে যান এবং নতুন করে একটি প্রেসক্লাব গঠন করেন। ওই প্রেসক্লাবের সদস্য বৃদ্ধি করতে নতুন নতুন ব্যক্তিদের সাংবাদিকতায় প্রবেশ করানো হয়। হেরে গিয়ে শুধুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থে আবারও নালিতাবাড়ীতে সাংবাদিকদের মাঝে বিভেদ তৈরি করা হয়। প্রেসক্লাব হয় দু’টি। যদিও আমাদের প্রেসক্লাব গ্রহণযোগ্য সংবাদকর্মী, গ্রহণযোগ্য গণমাধ্যম এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক থেকে সবসময় এগিয়ে। এই প্রেসক্লাবে আসতে আমাকে গুণে গুণে বিশ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। যখন এসেছি তখন সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েই এসেছি। আমার এবং সোহেল ভাইয়ের নেতৃত্বে প্রেসক্লাব চার বছর অতিক্রম করেছে। এরমধ্যেই আমি এখানে ওখানে ধর্ণা দিয়ে শুভাকাঙ্খীদের কাছ থেকে আর্থিক ও আসবাবপত্রের অনুদান সংগ্রহ করি। সকল সহকর্মীর সহযোগিতা ও ভালোবাসায় ছোট একটি ধূমপানের দূর্গন্ধযুক্ত কক্ষ থেকে এসি সমৃদ্ধ একটি কনফারেন্স কক্ষ, সাংবাদিকদের সবসময় বসার আলাদা কক্ষ, সমৃদ্ধ বারান্দা, সিসি ক্যামেরার নিরাপত্তা, এলইডি টেলিভিশন, মোটরসাইকেল রাখার গ্যারেজ, প্রেসক্লাব ক্যান্টিন, কল্যাণ ফাণ্ড ও উন্নতমানের আসবাবপত্রসহ নানা কিছুতে সমৃদ্ধ করা হয় প্রেসক্লাবকে। চলতি বছরের গেল মার্চের প্রথমার্ধে পুনরায় নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে তা বন্ধ হয়ে যায়। অবেশেষে যা হচ্ছে তা সবার চোখের সামনেই হচ্ছে।
এখন কথা হলো, আমার পদের প্রয়োজনীয়তা। প্রথমত গত ২০০২ থেকে ২০২২ পর্যন্ত বিশ বছরে সাংবাদিকতায় আমার যে সমৃদ্ধি তার পেছনে প্রেসক্লাব ছিল না। আর দায়িত্বে আজীবন থাকাও যায় না।
সুতরাং, আমার প্রয়োজনে পদে থাকা জরুরী নয়। আমি দায়িত্বে না থাকলে প্রেসক্লাবের ভবিষ্যত কি হবে তা গত চার মাসে অনেকেই অনুমান করেছেন। পক্ষান্তরে, প্রেসক্লাব নিয়ে মাতামাতি না করে আমার পেশাগত কাজে মনোনিবেশ করলে আমার কাজের গতি কতটুকু বাড়ে ও কতোটা সমৃদ্ধ হই তাও আপনারা অনেকেই দেখছেন। কাজেই সবসময় আমাকে বড় চেয়ারটি পেতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। খুবই স্পষ্ট বিষয়। প্রেসক্লাবের সাধারণ সদস্য থাকতেও আমার আপত্তি নেই। যেহেতু গঠনতন্ত্র মেনে আমি আজীবন সদস্য পদ লাভ করেছি। একই সাথে শ্রদ্ধেয় গৌতম পাল এবং বন্ধু রাকিবুল ইসলাম রাকিব আজীবন সদস্য পদ লাভ করেছেন। কথা হলো, যদি কোথাও রাখা হয় তা হতে হবে সম্মানজনক। যারা আমার সাথে হেরেছেন, যাদের কর্মদক্ষতা ও গণমাধ্যম আমার চেয়েও দূর্বল, তাদের পরে আমার নামের অন্তর্ভূক্তি বড়ই বেমানান। এটি হয়তো জানার অভাব, নয়তো রুচির দূর্ভিক্ষ নয়তো ষড়যন্ত্র।
আমি মনে করি, প্রেসক্লাবের সদস্য না হয়েও যদি বিশ বছর কাটাতে পারি, আজীবন সদস্য হয়ে কেন জীবনের বাকী সময়টা কাটাতে পারব না? কিন্তু আমাকে অসম্মান করার অধিকার কারও নেই। যদি করেন, তবে ভোটের মাধ্যমে গণমাধ্যমকর্মীরাই করবেন। আপত্তি এখানেই। হীরা ভাই, সামেদুল মামারা যদি চেয়ারে না থেকে চলতে পারেন, আমার বেলায় তা আরও সহজ হওয়ার কথা। কার বেলায় কি হয় জানি না। আমাদের (আমি ও সোহেল ভাই) বেলায় চেয়ারের সম্মান প্রাপ্তি ব্যতীত নিজেদের কাজের গতি কমেছিল, অন্যান্য দিকেও ঘাটতি হয়েছিল। যা এখন সমৃদ্ধ হচ্ছে। এটি নিন্দুকেরা বলবে না। তবে অধিকাংশেরা স্বীকার করবেন।
যেহেতু বর্তমানে যে কমিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তা আমাদের নিয়ে আলোচনা করে করা হয়নি এবং এটি একটি আহবায়ক কমিটি। দুই প্রেসক্লাবকে একীভূত করতে স্থানীয় সংসদ সদস্য এমন উদ্যোগ নিয়েছেন। তাই আমরা অপেক্ষা করব এর শেষ দৃশ্যটা দেখতে। অবশ্যই ভালো কিছু হোক এমন প্রত্যাশা করব।
চলমান-