
– মনিরুল ইসলাম মনির –
গত পর্বে আমি যা আলোচনা করেছিলাম, তার মাঝে কেউ কেউ কিছু বিষয় নিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। প্রথমত, চুলচেরা ইতিহাস বা ঘটনা বর্ণনা করতে গেলে পড়তে গিয়ে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটবে। এমনিতেই লেখা অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে। তাই বিকৃত নয়, সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। প্রেসক্লাব সামেদুল ইসলাম তালুকদারের আহবানে ও আগ্রহে এমনকি তারই উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এতে কোন দ্বি-মত নেই। বরং দ্বি-মত করা মানে তারাই ইতিহাস বিকৃতকারী। ওই সময় গৌতম পাল, বিপ্লব দে কেটু, মরহুম ইদ্রিস আলী, প্রয়াত সুশীল রায়, খন্দকার আব্দুল আলীম, আব্দুল করিমসহ কয়েকজন ওই ক্লাবের সদস্য হন এবং কমিটি গঠন করেন।
দ্বিতীয়ত, দলীয় ঘরাণার বিষয়টি অনেকে ভিন্নভাবে বুঝেছেন। আমরা যে যতো কথাই বলি, ভোট তো দেই? তাহলে ভোট কোন প্রতীকে দেই? নিশ্চয়ই যে প্রতীকে জাতীয় ভোট প্রদান করি আমি সে দলের সমর্থক? ভোট দিলে আর ঘারাণার হলেই কেউ সাংবাদিকতায় দলীয়করণ করেন না। অনেকের কোন দলের প্রতি মৌন সমর্থন থাকলেও কাজের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেন। আমাদের মাঝেও অনেকেই এমন আছেন। কাজেই দলীয় ঘরাণার বললে বা হলে দোষের কিছু দেখি না। অযথা গায়ে মাখার বিষয় না।
এবার আসি মূল কথায়। প্রেসক্লাবে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার আগেই আমরা সোহেল ভাই এর নেতৃত্বে সভা আহবান করি। ওই সভায় সবার মৌখিক অনুমোতি নিয়ে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রেসক্লাবের অবকাঠামোগত পরিবর্তনে হাত দেই। নিজেকে প্রচারের জন্য নয়, এটাই সত্যি- প্রত্যেকটা ডোনারের কাছে আমাকেই চাইতে হয়েছে। এরমধ্যে বেশিরভাগ আমার ব্যক্তিগত ডোনার ছিলেন। যারা বাংলার কাগজ প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত ডোনেশন করতেন। তারাই আবার প্রেসক্লাবে ডোনেশন করেছেন, আমি নির্বাচিত হয়েছি বলে খুশিতে। আমাকে করেননি, প্রেসক্লাবকেই করেছেন। কিন্তু জোগাড় করতে হয়েছে একা আমাকে। তবে এক্ষেত্রে সভাপতি সোহেল ভাই ও অন্যান্যর অধিকাংশের অকুণ্ঠ সমর্থন, আত্মবিশ্বাস এবং কাজ করার স্বাধীনতা প্রদান আমাকে কাজ করতে সাহস জুগিয়েছে, এটা অনস্বীকার্য। ডিস্টার্ব করলে বা নানা নিয়মের বেড়াজালে আটকালে কাজের গতি কমে যেতো। কাজেই সভাপতিসহ যারা আমাকে নানাভাবে আন্তরিকতা দিয়ে পাশে রয়েছেন তাদের প্রতি অকৃতজ্ঞ হওয়ার সুযোগ আমার নেই। অবশ্য দু-তিন জন নানাভাবে প্রেসক্লাবের কাজের গতি আটকানোর চেষ্টাও করেছেন।
এবার আসেন, আমাদের সময়ে আমরা কি কি উদ্যোগ নিয়েছিলাম পেশাগত মানোন্নয়নে। যেখানে সরকার এ পেশার মানোন্নয়নে নতুন নতুন পরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে। সেখানে আমাদেরও যাত্রা ছিল সামনের দিকে। আমাদের গঠনতন্ত্রে প্রেসক্লাবের সদস্য পদ পেতে নতুন বিধান অনুযায়ী ন্যুনতম এইচএসসি বা সমমান উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নতুন করে কেউ সদস্য হতে হলে তাকে ন্যুনতম এইচএসসি বা সমমান উত্তীর্ণ হতে হবে। একই সাথে নিবন্ধিত যে কোন গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে দুই বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। যে কেউ নতুন কার্ড করেই সদস্য হতে পারবেন না। অনিবন্ধিত কোন গণমাধ্যমে কাজ করলেও তিনি সদস্য হওয়ার যোগ্যতা রাখবেন না। জঙ্গী বা বিতর্কিত কোন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত থাকলে সদস্য হিসেবে যোগ্যতা হারাবেন তিনি। সাধারণ সম্পাদক বা সম্পাদক মণ্ডলীর যে কোন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সাংবাদিকতা পেশায় ন্যুনতম সাত বছরের অভিজ্ঞতা ও দুই বছরের প্রেসক্লাবের সদস্য পদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সভাপতি পদে ন্যুনতম দশ বছরের সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞতা ও পাঁচ বছরের সদস্য পদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমার পরিকল্পনা ছিল, চলতি বছর নতুন কমিটি গঠন করা হলে ন্যুনতম বিএ বা সমমান পাশ না হলে সদস্য পদ দেওয়া হবে না, এমন বিধান করা।
উপরোক্ত শর্ত ছাড়াও নানা শর্ত আরোপ করা হয়েছিল গঠনতন্ত্রে। এতে করে, নন মেট্টিক শ্রমিক শ্রেণির বা কোনমতে টেনেটুনে এসএসসি পাশ ব্যক্তি, ফেসবুক মার্কা কথিত সাংবাদিক, বা অনিবন্ধিত অনলাইনের কার্ডধারী, টাকার বিনিময়ে কার্ড সংগ্রহকারী অনিয়মিত অপেশাদার সাংবাদিক সদস্য হতে পারতেন না। নতুন প্রবেশ করেই কোন প্রকার অভিজ্ঞতা ছাড়া পদপদবি দখল করে সেই পদের দায়িত্ব পালনে অপরিপক্কতা কম প্রকাশ পেতো। এতে করে সাংবাদিকতার মতো মহান এ পেশার মান অপেক্ষাকৃত বজায় থাকতো, প্রেসক্লাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন আরও সমৃদ্ধ হতো এবং সাধারণের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য সংগঠন হিসেবে বিবেচিত হতো।
অন্যদিকে আমাদের ক্লাবের কাউন্টারে যে ক্লাব সৃষ্টি করা হয়েছে, তাতে পেশাদার সাংবাদিকতা চর্চার চেয়ে অপেশাদার আচরণই বেশি হয়। ফলে বিতর্কে জড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের ক্লাবটিও। শুধুমাত্র এই একটি বৃহৎ কারণেই ঐক্যবদ্ধ প্রেসক্লাব করতে আমিসহ আমাদের অনেকের আপত্তি। আমাদের ক্লাবে যারা রয়েছেন, তাদের অধিকাংশই ভালো ভালো গণমাধ্যমে পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করেন। আমাদের সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে তুলনামূলক বিতর্ক কম হয়। আমাদের নিজস্ব কল্যাণ ফাণ্ড থাকায় আমাদের অর্থনৈতিক শক্তি রয়েছে। যা শুধুমাত্র আমাদের কল্যাণে ব্যয় করা হয়। অন্যদিকে ওই ক্লাবের কোন কল্যাণ ফাণ্ড নেই। আমাদের ক্লাবে উপদেষ্টা হতে যেমন কিছু শর্তারোপ করা আছে, তেমনি আজীবন সদস্য ও দাতা সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিধান রয়েছে। এসব বিধান রক্ষা করে যে কোন পদ যে কেউ অলঙ্করণ করলে আমাদের পেশার মান যেমনি বাড়বে, তেমনি সংগঠনের গুরুত্বও বাড়বে।
এসব কারণেই আমাদের আপত্তি। যদি বাছাই করে পেশাদার সাংবাদিকদের মাধ্যমে একটি শৃঙ্খল একীভূত প্রেসক্লাব গঠন করা হয়, তবে তা অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার। কিন্তু বর্তমানে যে পথে হাঁটছে প্রিয় সংগঠন, সবাই লিখে রাখেন, সাংবাদিকতা পেশার সম্মান তলানিতে পৌছাবে দ্রুত। সংগঠনের গ্রহণযোগ্যতা তুমুল বিতর্কে জড়াবে।
আমার আপত্তি নতুন কমিটি গঠন প্রক্রিয়া এবং কিছু ব্যক্তি বিশেষ। সামগ্রিকভাবে নয়। যাকে আহবায়ক দেওয়া হয়েছে, তিনি আমার সাথে সাধারণ সম্পাদক পদে হারলেও বর্তমানে আমাদের সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন। আমরাই তাকে ভোট দিয়ে বানিয়েছি। অবশ্যই তিনি আমার বয়স ও পেশার বয়সে সিনিয়র। সবার সবকিছু সমান হয় না। আহবায়ক হিসেবে তাকে ঘিরে আপত্তি না থাকাটাই স্বাভাবিক। আমি তাকে অবশ্যই সম্মান করি। সদস্য সচিব যিনি হয়েছেন, সাংবাদিকতায় আমার অনেক পরে এসেছেন এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক প্রশ্নও থাকতে পারে। সর্বোপরি বয়স, কর্মরত গণমাধ্যম এবং একটি ক্লাবের সভাপতি হিসেবে তিনিও সদস্য সচিবের দাবীদার। পেশাদারিত্ব বিবেচনায় আমার আপত্তি এখানেও নেই। একিভূত হতে হলে কিছু ছাড় দিতেই হবে। সমস্যা হলো অন্যান্য অনেক সদস্য নিয়ে। একটি নির্বাহী কমিটি হতে হবে সর্বোচ্চ মানদণ্ডে। হতে হবে, উভয়পক্ষের সাথে সরাসরি আলোচনাসাপেক্ষে। নিঃসন্দেহে আমাদের এমপি সাহেবের উদ্দেশ্য মহৎ। তিনি দলমতের ঊর্ধে একীভূত প্রেসক্লাব গঠনে মনযোগ দিয়েছেন। তবে সমস্যা হলো, তাকে মিসগাইড করা হচ্ছে। সঠিক তথ্য ও সঠিক পরামর্শ নিজেদের স্বার্থেই কেউ দিচ্ছেন না।
আমি বলি অপেক্ষা করুন সবাই। হীতে বিপরীত হবে। হলফ করে বললাম, আমরা যারা মূলধারার এবং পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করি, আমরা আমরাই রব। শুধুমাত্র একটি সাজানো-গোছানো সংগঠন কিছু হীনমন্য ব্যক্তির জন্য ধ্বংস হবে। স্বার্থ ফুরালে সকলেই কেটে পড়বে। নষ্ট হবে সংগঠন, লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে উদ্দেশ্য। আমার বা আমাদের মতো অনেকেরই সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা নেই। সংগঠন করি নিজেদের ঐক্যবদ্ধ ও সমৃদ্ধ রাখতে। নতুনদের জন্য কাজের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে। আমি এ পেশায় স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি এই প্রেসক্লাবের বাইরে থেকেই। আমার মতো সারাদেশে এমন অনেকে রয়েছেন, পদে তো দূরের কথা কোন ক্লাবে ইচ্ছে করেই থকেন না এই নোংরা পরিবেশের জন্য। হয়তো আমাদেরও এমন পরিবেশ হতে পারে যে, অনেকে ক্লাবের বাইরে থেকে যাব সম্মান বাঁচাতে। মনে রাখতে হবে, ক্লাব কখনো ভালো সাংবাদিক বানায় না। ভালো সাংবাদিকরা ভালো ক্লাব বানান। আর ক্লাব যদি ভালো সাংবাদিকরা পরিচালনা করেন, তাহলে সেখানে কিছু ভালো সাংবাদিক তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। আমি এবং আমার মতো অনেকে এ প্রেসক্লাব থেকে পেশাদার সাংবাদিক হইনি। উপরন্তু আমার মতো অনেকের পরশে এই ক্লাব সমৃদ্ধ হয়েছিল। কথাটি অনেকের কাছে আত্মপরিতৃপ্তির বা নিজেকে জাহিরের মতো মনে হলেও এটাই দ্রুব সত্য। সময়সাপেক্ষে প্রমাণ হয়েছে, আরও হবে।
যেখানে শ্রদ্ধেয় মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল ভাই, হীরা ভাই, সামেদুল মামা ও গৌতম পালের মতো ব্যক্তিদের গুণে এবং পরামর্শে আমরা ধন্য হতাম, সেখানে হয়তো এসব ব্যক্তিদের অনেকের পদচারণা বন্ধ হয়ে যাবে। যদি বর্তমান অবস্থা বিরাজ করে। তাদের প্রাপ্য সম্মান না দিলে ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায় সূচিত হবে। যুগে যুগে এভাবেই বিভিন্ন সংগঠন মীর জাফর আর ঘষেটিদের ষড়যন্ত্রে নষ্ট হয়েছে। পক্ষান্তরে, ইতিহাস আর সময় তাদেরও আস্তাকুড়ে ফেলে দেবে।
চলমান-